যুদ্ধের কারণে বিশ্ব বাজারের অস্থিরতায় দেশীয় অর্থনীতিতে চাপ বাড়ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে এই চাপ সামাল দিয়ে বাজেট বাস্তবায়নে ঝামেলা হবে না বলেও আশ্বস্ত করেছেন সরকার প্রধান। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন প্রাঙ্গণে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির দ্বিবার্ষিক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। শেখ হাসিনা জানান, দেশ যখন এগিয়ে যাচ্ছিলো, তখন বৈশ্বিক কিছু ইস্যুতে দেশীয় অর্থনীতিতেও চাপ বাড়ছে। তবুও সব সামাল দেয়ার চেষ্টা চলমান রেখেছে সরকার। টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে আগামীতে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে অর্থনীতিবিদদের নিজস্ব গবেষণা-নীতি অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, সব বাধা অতিক্রম করে নিজেদের বুদ্ধি-অভিজ্ঞতায় দেশকে এগিয়ে নিতে কাজ করতে হবে অর্থনীতিবিদদের। দেশকে এগিয়ে নিতে সরকারের পাশে থাকতে হবে। অর্থনীতির সূক্ষ্ম ও জটিল বিষয় আমি বুঝি না, কিন্তু কীভাবে দেশের মানুষের কল্যাণ করতে হয় এটা বুঝি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি আজ অর্থনীতি সমিতির প্রোগ্রামে আসছি। এখানে অনেকের অনেক বড় বড় ডিগ্রি আছে। আমার কিন্তু তা নেই। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ পাস করেছি। অর্থনীতির সূক্ষ্ম ও জটিল বিষয়াদি আপনাদের মতো আমি বুঝি না। এতটুকু বুঝি কীভাবে দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করতে হয়। কীভাবে মানুষের উপকার হবে। আমার বাবা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছ থেকেই আমি এটা শেখেছি।
৩২ নম্বরে আমাকে ঢুকতে দেয়নি জিয়া: আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি জানতাম না যে, আমাকে এতবড় একটা দায়িত্ব দেয়া হবে। আমি কখনো এটা ভাবতে পারিনি। ছোটবোন শেখ রেহানার বিয়েতে অংশ নিতে পারেননি বলে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, কিন্তু যখন তার বাচ্চা হবে, মিসেস গান্ধী আবার ক্ষমতায় এলেন, তিনি সব ব্যবস্থা করে দিলেন, আমি গেলাম। এরপর আবার দিল্লিতে ফেরত এলাম। তখন আমাকে লন্ডন থেকে আওয়ামী লীগের নেতা মাহবুবুর রহমান টেলিফোন করে বললেন আপনাকে দলের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়েছে। আমি তাকে বললাম আমি তো আওয়ামী লীগের সভাপতি হতে চাই না, আমাকে কেন করবে? আওয়ামী লীগের অনেক নেতা আছে। ১৯৮১ সালের ১৭ মে-এর ঘটনা বর্ণনা করে শেখ হাসিনা বলেন, ঝড়-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে সেদিন সাধারণ মানুষ সেখানে গিয়েছিল। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে বক্তব্য রাখলাম, সবচেয়ে বড় কথা হলো আমি যখন যাই তখন কামাল, জামাল, রোজি, খুকি সবাই বিমানবন্দরে ছিল। আমি যখন ফিরে এলাম পেলাম বনানীতে সারি সারি কবর। তিনি বলেন, ৩২ নম্বরে আমরা মিলাদ পড়তে চাইলাম আমাকে ঢুকতে দেয়নি জিয়াউর রহমান। উল্টো বলেছিল বাড়ি দেবে, গাড়ি দেবে, সব দেবে। বলেছিলাম তার কাছ থেকে কিছু নেবো না। খুনির কাছ থেকে আমি কিছু নিতে পারি না। আমি যখন এলাম ৩২ নম্বরে ঢুকতে দেবে না, উল্টো বাড়ি-গাড়ি সাধবে, সেটাতো আমার কাছে গ্রহণযোগ্য না। দেশে ফিরে কোথায় উঠবেন, থাকবেন সেটা জানতেন না উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, শুধু আমার পরার কাপড়-চোপড়, দুটো স্যুটকেস ও পুতুলকে (মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল) নিয়ে আমি চলে এসেছি। তারপর এ যাত্রা শুরু। আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতাকর্মী ও দলকে গোছানোর চেষ্টা করেছি। তিনি বলেন, আজ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নেই, কিন্তু অন্তত এটুকু বলতে পারি, তার বাংলাদেশ, কিছুটা হলেও তিনি যে আকাক্সক্ষা নিয়ে দেশ স্বাধীন করেছিলেন এবং যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে দেশ স্বাধীন করেছিলেন কিছুটা হলেও সেটা আমরা বাস্তবায়ন করতে পেরেছি। এসময় আবেগাপ্লুত হয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আমার বাবার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলবো, আমার সব শক্তি-সাহস মা-বাবার কাছ থেকে পেয়েছি। যেদিন আমার বাবাকে হত্যা করা হয়... উনিতো কোনোদিন বিশ্বাস করেননি বাঙালিরা তাকে হত্যা করতে পারবে। আমার মা কখনো জীবন ভিক্ষা চাননি। ১৫ আগস্টের ঘটনা বর্ণনা করে শেখ হাসিনা বলেন, এই ঘাতকের দল মনে হচ্ছিল একটি পরিবারকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করবে। শুধু পরিবার না আমাদের যারা আত্মীয়-স্বজন আছে তাদেরও। এসময় ৩ নভেম্বর কারাগারে জাতীয় চার নেতা হত্যার ঘটনাও বর্ণনা করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, যারা স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন, সংগ্রাম করলেন সারাটা জীবন, সেই বাংলার মাটিতে, বাঙালির হাতেই তাদের মৃত্যুবরণ করতে হলো। তাও স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে। অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধ্বংস করা আর যুদ্ধাপরাধীরা ক্ষমতায়।
খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি ও এলিট শ্রেণি তৈরি করেছিলেন জিয়া: এর আগে বেলা ১১টায় ‘বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির ২২তম দ্বিবার্ষিক সম্মেলন-২০২৪’- এর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি ও এলিট শ্রেণি তৈরি করেছিলেন জিয়াউর রহমান। অনুষ্ঠানটি শুরু হয় সকাল ১০টায় রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে। শেখ হাসিনা বলেন, গ্রামের মানুষও যাতে নাগরিক সুবিধা পায় সেজন্য তৃণমূল থেকে উন্নয়ন বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। শেখ হাসিনা বলেন, অর্থনীতির অনেক বড় বড় সঙ্গা আমি হয়তো বুঝবো না। কিন্তু একটা জিনিস বুঝি, মানুষের জন্য কাজ করতে হবে। মানুষ কি পেলো সেটা দেখতে হবে। মানুষের কল্যাণে কি করণীয় সেটা করতে হবে। যা আমি শিখেছিলাম আমার বাবার কাছ থেকে। তিনি তো বেশিরভাগ সময়ই জেলে থাকতেন। যতক্ষণ বাইরে থাকতেন, আমাদের সঙ্গে গল্প করতেন- কীভাবে দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে চান, কীভাবে গ্রামগুলোকে সাজাবেন। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু একটা কথা বলেছিলেন, আমার মাটি আছে, মানুষ আছে। এই সোনার মাটি আর মানুষ দিয়েই আমি আমার দেশ গড়ে তুলব।
আগামী ৬ জুন বাজেট দেবো: শেখ হাসিনা বলেন, আমরা আগামী ৬ তারিখে বাজেট দেবো। বাজেট আমরা ঠিকমতো দিতে পারবো, বাস্তবায়নও করবো। দেশি-বিদেশি নানা কারণে জিডিপি কিছুটা হয়তো কমবে, সেটা পরবর্তীসময়ে উত্তরণ করতে পারবো, সে আত্মবিশ্বাসও আছে। তিনি আরও বলেন, গ্রামের অর্থনীতি পাল্টে গেছে। যারা একবেলা ভাত খেতে পারতো না, এখন চারবেলা খায়। একসময় গ্রামে হাটবারের বাইরে কিছু পাওয়া যেতো না, এখন সুপার মার্কেট হয়েছে। আমাদের গ্রামের বাজার পাটগাতিতে (পাটগাতি টুঙ্গিপাড়ার একটি ইউনিয়ন) ঈদের আগে ২০০টি ফ্রিজ বিক্রি হয়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতি যত বেশি মজবুত হচ্ছে, শিল্প-কলকারখানাও তত বাড়ছে।
চক্রান্ত মোকাবিলা ধরে রাখতে হবে: আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেছেন, আজ বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সবচেয়ে শক্তিশালী ও বড় সংগঠন। জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য দল আওয়ামী লীগ। প্রতিবার চক্রান্ত হয়, সেটা মোকাবিলা করে আমরা বেরিয়ে আসি। আমাদের তা ধরে রাখতে হবে। বাংলাদেশের মানুষ রক্ত দিয়ে যে অধিকারগুলো আদায় করেছিল, সেটা আমরা সমুন্নত করতে পেরেছি। কিন্তু আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে। তিনি বলেন, কী পেলাম না পেলাম সেই চিন্তা করিনি। ভবিষ্যৎ কী সেই চিন্তাও করি না। চিন্তা করি দেশের মানুষের ভবিষ্যতটা আরও সুন্দরভাবে গড়ে দিয়ে যাব, সেটাই আমাদের লক্ষ্য। দলীয় নেতাদের উদ্দেশে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, এটাই মনে রাখবেন, একটা দল করি শুধু নেতা হওয়া না, মানুষের জন্য কতটুকু করতে পারলাম, কী দিতে পারলাম, কী দিয়ে গেলাম– এটাই রাজনীতিকের জীবনের বড় কথা। এই কথাটা মাথায় রাখতে পারলে দেশের মানুষের জন্য অনেক কিছুই করা যেতে পারে। সংগঠনকে শক্তিশালী করার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, আর যেন যুদ্ধাপরাধী-খুনিরা যেন বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে না পারে। এ ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে, বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে হবে।
আজকের বাংলাদেশ বদলে যাওয়া বাংলাদেশ: আজকের বাংলাদেশ বদলে যাওয়া বাংলাদেশ বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, মানুষের যদি রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনা না থাকে, দেশপ্রেম না থাকে, সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় না থাকে, তাহলে সেটা এগুতো পারে না। পঁচাত্তরের যারা ক্ষমতায় ছিল তারা নিজেদের ক্ষমতা কুক্ষিগত করার চেষ্টা করেছিল, দেশের কোনও উন্নতি করতে পারেনি। আজ আমরা বলতে পারি দেশটা বদলে যাওয়া, বদলাতে পেরেছি। সামনে আরও বদলাতে হবে। কারণ আমার বাবার একটাই স্বপ্ন ছিল দেশটাকে গড়ার। আমাদের পরিকল্পনা সেটাই আছে।
গণভবনে যা বললেন শেখ হাসিনা: আওয়ামী লীগ দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী সংগঠন ও জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক দল বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল শুক্রবার গণভবনে শেখ হাসিনার ৪৪তম স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে তাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা। এরপর দলটির সহযোগী এবং ভাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। সমবেত নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে নির্বাসিত জীবন, দেশে ফেরা ও পরবর্তী নানা ঘটনা তুলে ধরে বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পূর্বে বিদেশে যাওয়ার ঘটনা বর্ণনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আশা করেছিলাম আমরা খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসবো। কিন্তু সেই ফিরে আসা আর হয়নি। ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর দিল্লি ও লন্ডনে নির্বাসিত জীবনের চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আমি যখন দিল্লিতে ছিলাম সেখানে গিয়ে জিয়াউর রহমান আমার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিল, তার স্ত্রীও দেখা করতে চেয়েছিল, আমি দেখা করি নাই। লন্ডনে যখন তখনও দেখা করতে চেয়েছিল, আমরা দেখা করিনি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর বিদেশে দীর্ঘ নির্বাসিত জীবন থেকে ১৯৮১ সালের ১৭ মে তিনি দেশে ফেরেন। এরপর থেকে শেখ হাসিনা গত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া বাংলাদেশের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। দলটি সেই থেকে ১৭ মে সভাপতি শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস পালন করে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata

# আ’লীগ সবচেয়ে শক্তিশালী সংগঠন, জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য দল # আগামী ৬ জুন বাজেট দেবো, বাস্তবায়নও করবো # খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি ও এলিট শ্রেণি তৈরি করেছিলেন জিয়া
অর্থনীতির সূক্ষ্ম বিষয় নয় শুধু মানুষের কল্যাণ বুঝি : প্রধানমন্ত্রী
- আপলোড সময় : ১৭-০৫-২০২৪ ০৮:১৫:৩৬ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ১৭-০৫-২০২৪ ১১:০১:১০ অপরাহ্ন


কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ